দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর কক্ষপথে মানবজাতির স্থায়ী উপস্থিতির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) ধীরে ধীরে তার কার্যকাল শেষের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আইএসএসের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো—এর বিকল্প হিসেবে যে বাণিজ্যিক বা বেসরকারি মহাকাশ স্টেশনগুলো দায়িত্ব নেবে, সেগুলোর কোনোটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
নাসার লক্ষ্য লো-আর্থ অরবিটে (পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে) মহাকাশচারীদের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি বজায় রাখা। এই লক্ষ্য পূরণে সংস্থাটি ধীরে ধীরে সরকারি অবকাঠামোর পরিবর্তে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে চায়। তবে প্রয়োজনীয় নীতিমালা, কারিগরি মানদণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় পরবর্তী প্রজন্মের মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
বর্তমানে এই প্রতিযোগিতায় চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে—ভয়েজার টেকনোলজিস, অ্যাক্সিওম স্পেস, ব্লু অরিজিন ও ভাস্ট স্পেস। নাসা চলতি বছরের শেষ নাগাদ তাদের মধ্য থেকে এক বা দুটি প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের চুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইএসএসের কার্যকাল শেষ হতে যেখানে আর মাত্র পাঁচ বছর বাকি, সেখানে এখনো বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি নির্দেশিকা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বিনিয়োগ, নকশা ও নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি চাপ ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এই দৌড়ে তুলনামূলকভাবে আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে ভাস্ট স্পেস। প্রতিষ্ঠানটি ‘হেভেন-১’ নামে একটি ছোট আকারের মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের কাজ করছে, যা মূলত স্বল্পমেয়াদি মানব মিশনের জন্য পরিকল্পিত। ভাস্ট স্পেসের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই স্টেশন উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ম্যাক্স হাফট জানিয়েছেন, হেভেন-১–এর মূল কাঠামো ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, উৎক্ষেপণের পর হেভেন-১ প্রথমে মানুষবিহীন অবস্থায় কক্ষপথে পরিচালিত হবে। এ সময় পৃথিবী থেকেই স্টেশনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুল ব্যবহার করে নভোচারীদের সেখানে পাঠানো হবে। এই স্টেশন প্রায় তিন বছর সক্রিয় থাকবে এবং এতে দুই সপ্তাহ মেয়াদি একাধিক ছোট মিশন পরিচালনার সুযোগ থাকবে।
মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নাসা যদি দ্রুত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে না পৌঁছায়, তাহলে আইএসএসের অবসর গ্রহণ এবং নতুন বাণিজ্যিক স্টেশনের কার্যক্রম শুরুর মাঝখানে একটি বড় সময়ের শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপরই পড়বে না; বরং মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃত্ব ও প্রভাবও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আইএসএসকে আরও কিছুদিন কার্যকর রাখার পথ বেছে নেওয়া হবে, নাকি দ্রুত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হবে—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহাকাশ শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নাসার সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

