মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এখন আর শুধু আকাশপথ বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সংঘাত ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ডিজিটাল জগতেও। যুদ্ধের পাশাপাশি এখন সাইবারস্পেসেও চলছে নীরব কিন্তু শক্তিশালী লড়াই, যেখানে সার্ভার, ডেটা নেটওয়ার্ক ও হ্যাকিং কৌশল হয়ে উঠেছে নতুন অস্ত্র। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান—যা বিভিন্ন সূত্রে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচিত—এর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সাইবার হামলার মাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার বিমান হামলার সময়ই ইরানের লাখো মানুষের স্মার্টফোনে হঠাৎ করে অস্বাভাবিক বার্তা দেখা যায়। দেশটির জনপ্রিয় ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অ্যাপ ‘বাদে সাবা’, যার ব্যবহারকারী প্রায় ৫০ লাখের বেশি, সেটি হ্যাক হয়ে যায়। ব্যবহারকারীরা একটি নোটিফিকেশন পান যেখানে লেখা ছিল—‘সহায়তা আসছে, এবার হিসাব চুকানোর সময়।’ প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বার্তার উদ্দেশ্য ছিল ইরানি জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সরকারের প্রতি আস্থা দুর্বল করা। একই সময় ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার ওয়েবসাইটেও হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে এবং সেখানে সরকারবিরোধী বিভিন্ন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রথাগত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় ইরান কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সাইবার সক্ষমতায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি হ্যাকার গ্রুপ ইতোমধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এপিটি৪২ ও এপিটি৩৩ নামের হ্যাকিং গ্রুপগুলোকে ইরানের অন্যতম প্রধান সাইবার আক্রমণকারী দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরানের তথাকথিত ‘ইসলামিক সাইবার রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিস’ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রাফায়েল এবং ড্রোন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নির্মাতা ভিজিলএয়ারের ওপর সাইবার হামলা চালিয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইক সতর্ক করেছে, ইরানি হ্যাকাররা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাত, জ্বালানি অবকাঠামো এবং শিল্পনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তাদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ওয়াইপার ম্যালওয়্যার’, যা কোনো কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ করে সেখানকার সব তথ্য স্থায়ীভাবে মুছে দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক সূত্র জানিয়েছে, সামরিক হামলার আগে ইরানের যোগাযোগব্যবস্থা ও সেন্সর নেটওয়ার্ক অকার্যকর করে দিতে সমন্বিত সাইবার ও স্পেস অপারেশন চালানো হয়েছিল। এতে ইরানের প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া ব্যাহত হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের রাস্তার ট্রাফিক ক্যামেরা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যও এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্যামেরার একটি অংশ কয়েক বছর আগেই হ্যাক করা হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যবহার করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রিয়েল-টাইম নজরদারি চালানো সম্ভব হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সাইবার শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তাদের গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০। এই ইউনিটটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটাতে ব্যবহৃত ‘স্টাক্সনেট’ ভাইরাসের পেছনেও এই ইউনিটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমান সংঘাতেও উন্নত সাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আংশিক সরকারি অচলাবস্থার কারণে দেশটির সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সিআইএসএ বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। সংস্থাটির জনবল কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ গ্রিড, জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার সাইবার সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ৫০টির বেশি ইরানপন্থী হ্যাকিং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর কিছু রাশিয়াপন্থী সাইবার দলও তেহরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব গ্রুপ র্যানসমওয়্যার, ডেটা চুরি এবং ডিডিওএস আক্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিকের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং অনেক জায়গায় তা প্রায় ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য সাইবার হামলা প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বিদেশি মেসেজিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্য, ডেটা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোও হয়ে উঠেছে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে, যেখানে একটি সাইবার আক্রমণই কখনো কখনো পুরো যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

