কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত গতি, স্বয়ংক্রিয়তা ও উৎপাদনশীলতার বিষয় সামনে আসে। কিন্তু এই প্রযুক্তির পেছনে লুকিয়ে থাকা শক্তি ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কথা হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই প্রযুক্তির বিস্তৃত প্রয়োগের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টন অতিরিক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হতে পারে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই অগ্রযাত্রা তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
গবেষকেরা বলছেন, এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব শুধু বড় বড় মডেল প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর প্রভাব আরও গভীর এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অফিস-আদালত, শিল্পকারখানা, ই-কমার্স, ফিনটেক ও ডিজিটাল সেবাখাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো কম সময়ে বেশি উৎপাদন করতে পারছে। কিন্তু এই উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবহারের মাত্রাও।
বিশ্ব অর্থনীতির অধিকাংশ খাত এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি ও প্রচলিত বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদন বাড়লে শক্তির চাহিদাও বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষভাবে কার্বন নিঃসরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার বিশ্লেষণ উন্নত করে উৎপাদন বাড়ালে পুরো সাপ্লাই চেইনে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও বেড়ে যায়—কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবহন ও খুচরা বিক্রি পর্যন্ত।
ডেটা সেন্টারগুলোও এআইয়ের শক্তি ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও সার্বক্ষণিক সেবা দিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার ও কুলিং সিস্টেম পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটা সেন্টারের সরাসরি বিদ্যুৎ খরচের চেয়ে এআই-চালিত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রভাব অনেক বেশি।
যদিও প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক মোট নিঃসরণের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ছোট অংশ, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর না এলে এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি না পেলে এআই-নির্ভর অর্থনীতি পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
তবে আশার কথা হলো, এআই নিজেই জলবায়ু সমাধানের একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। উন্নত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট গ্রিড পরিচালনা, লজিস্টিকস অপটিমাইজেশন, কার্বন ট্র্যাকিং ও নবায়নযোগ্য শক্তির দক্ষ ব্যবহারে এআই ইতিমধ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সঠিক নীতি ও টেকসই প্রযুক্তি বিনিয়োগের মাধ্যমে এআইকে পরিবেশবান্ধব রূপে গড়ে তোলা গেলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

