কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি মুখাবয়ব আর বাস্তব মানুষের ছবির মধ্যে পার্থক্য ধরতে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের যথেষ্ট দক্ষ মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব সক্ষমতার মিল খুবই সীমিত—আর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই ডিজিটাল প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় তৈরি ও অনলাইন জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার University of New South Wales–এর গবেষকেরা এক পরীক্ষায় দেখিয়েছেন, আধুনিক জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি মুখ অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব মানুষের ছবির সঙ্গে প্রায় অমিলহীন। ফলে খালি চোখে কোনটি আসল আর কোনটি এআই–নির্মিত, তা বোঝা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
আগের সূত্রগুলো আর কার্যকর নয়
একসময় এআই–তৈরি ছবিতে ত্রুটি শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ ছিল। দাঁতের অস্বাভাবিক বিন্যাস, চশমার ফ্রেমে বিকৃতি, কানের গঠনগত অসামঞ্জস্য কিংবা পটভূমির অদ্ভুত বিকৃতি—এসব ছিল ভুয়া ছবি ধরার সাধারণ সূত্র। কিন্তু উন্নত জেনারেটিভ মডেলের কারণে এখন সেই দৃশ্যমান ভুলগুলো প্রায় অদৃশ্য।
গবেষক অ্যামি ডাওয়েল বলেন, আধুনিক এআই–তৈরি মুখাবয়বের বড় বৈশিষ্ট্য হলো—সেগুলো অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত। মুখাবয়ব সুষম, অনুপাত ভারসাম্যপূর্ণ এবং গড়পড়তা বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় সেগুলো আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হয়। তাঁর ভাষায়, “সমস্যা ত্রুটিতে নয়; বরং অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়াতেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।”
১২৫ জনের অনলাইন পরীক্ষা
গবেষণায় ১২৫ জন অংশগ্রহণকারীকে অনলাইনে বিভিন্ন মুখের ছবি দেখানো হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়—ছবিগুলো বাস্তব মানুষের, নাকি এআই দিয়ে তৈরি। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮৯ জন ছিলেন সাধারণ ব্যক্তি এবং ৩৫ জন ছিলেন তথাকথিত ‘সুপার রিকগনাইজার’—যাঁরা মুখ শনাক্তকরণে বিশেষ দক্ষতার জন্য পরিচিত।
সহগবেষক ড. জেমস ডান জানান, সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা কাকতালীয় অনুমানের তুলনায় সামান্য ভালো ফল করলেও তাঁদের সাফল্যের হার খুব বেশি ছিল না। সুপার রিকগনাইজাররা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো করলেও ব্যবধান ছিল সীমিত। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়—অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী নিজেদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যদিও তাঁদের প্রকৃত ফলাফল সেই আত্মবিশ্বাসকে সমর্থন করেনি।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে British Journal of Psychology–এ।
ডিজিটাল প্রতারণার নতুন ঝুঁকি
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই–নির্মিত মুখাবয়ব ব্যবহার করে ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল, ফিশিং স্ক্যাম, আর্থিক প্রতারণা এবং পরিচয় জালিয়াতি বাড়তে পারে। আগে যেখানে সন্দেহজনক ছবি দেখে ব্যবহারকারীরা সতর্ক হতে পারতেন, এখন সেখানে নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য চেহারা ব্যবহার করে প্রতারকেরা সহজেই আস্থা অর্জন করতে পারছে।
ড. ডান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একটি ধারণা ছিল—ছবি মানেই বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু জেনারেটিভ এআই সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।” তাঁর মতে, মানুষকে কিছু নির্দিষ্ট ‘ট্রিক’ শেখানোর চেয়ে নিজেদের বিচারক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ধরনের দক্ষতার ইঙ্গিত
গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েকজন সাধারণ অংশগ্রহণকারী এমন ফলাফল করেছেন যা কিছু সুপার রিকগনাইজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল বিশেষজ্ঞ বনাম সাধারণ মানুষের পার্থক্যের নয়। গবেষকেরা ধারণা করছেন, হয়তো এমন এক নতুন ধরনের জ্ঞানগত দক্ষতা রয়েছে, যা বিশেষভাবে এআই–তৈরি মুখ শনাক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু মানবিক পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর না করে স্বয়ংক্রিয় যাচাইকরণ টুল, এআই–ডিটেকশন সফটওয়্যার এবং মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার বাড়ানো জরুরি হবে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, বাস্তব ও কৃত্রিমের সীমারেখা তত সূক্ষ্ম হয়ে উঠছে। তাই কেবল চোখের বিশ্বাসে নয়, প্রযুক্তিগত যাচাইয়ের ওপর আস্থা বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

