মহাকাশ থেকে যদি সরাসরি সেলফি তোলা যায়—কেমন হবে অভিজ্ঞতাটা? এই কল্পনাই এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা দিয়েছে, আসন্ন ক্রু–১২ ও আর্টেমিস–২ অভিযানের নভোচারীরা মহাকাশে নিজেদের ব্যক্তিগত স্মার্টফোন সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন।
মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় এবং যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কারণ, এত দিন মহাকাশে যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাঠাতে হলে সেটিকে বহু স্তরের কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো। নাসার এই নতুন সিদ্ধান্তে নভোচারীরা এখন মহাকাশ থেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা আরও স্বাধীনভাবে ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে ধারণ করতে পারবেন।
মহাকাশ ফটোগ্রাফিতে আসছে মানবিক ছোঁয়া
নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ৫ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ফলে মহাকাশ ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফিতে আরও ব্যক্তিগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হবে।
এত দিন মহাকাশে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলো মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজনে নির্ধারিত ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য মহাকাশের জীবনযাপন অনেকটাই দূরের ও অপরিচিত মনে হতো। স্মার্টফোন ব্যবহারের মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এত দিন নিষেধাজ্ঞা ছিল?
মহাকাশে স্মার্টফোন ব্যবহার সহজ বিষয় নয়। নাসা সব সময় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্ক থাকে। কারণ, মহাকাশের তীব্র বিকিরণ (রেডিয়েশন) স্মার্টফোনের সেন্সর, ক্যামেরা কিংবা প্রসেসরে ক্ষতি করতে পারে। এমনকি সামান্য ত্রুটিও পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫০ মাইল ওপরে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই আর্টেমিস কর্মসূচিতে এত দিন অনুমোদিত ক্যামেরার তালিকায় ছিল ২০১৬ সালের নিকন ডিএসএলআর এবং প্রায় এক দশক পুরোনো গো–প্রো ক্যামেরা। আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি না থাকায় নভোচারীদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণের সুযোগ সীমিত ছিল।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নতুন গল্পের শুরু
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) জনবল সংকট রয়েছে। ক্রু–১২ মিশনে চারজন নভোচারী সেখানে যাবেন। তারা যদি স্মার্টফোনে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ, অবসর সময় কিংবা জানালার বাইরে ভেসে থাকা পৃথিবীর দৃশ্য ধারণ করে শেয়ার করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে মহাকাশ স্টেশন আরও পরিচিত, বাস্তব ও আপন হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহী করে তুলতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
আর্টেমিস–২: ৫০ বছরে চাঁদের পথে প্রথম মানবযাত্রা
অন্যদিকে আর্টেমিস–২ মিশন হতে যাচ্ছে গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে চাঁদের দিকে প্রথম মানববাহী অভিযান। এই মিশনে চার নভোচারী প্রায় ১০ দিন ধরে চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করবেন। স্মার্টফোনের ক্যামেরায় ধরা পড়া চাঁদ, মহাকাশযান ও পৃথিবীর দৃশ্য ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হয়ে থাকতে পারে।
মহাকাশে অ্যাপল ডিভাইস নতুন নয়
যদিও স্মার্টফোন ব্যবহারের অনুমতি এবারই প্রথম আলোচনায় এসেছে, তবে মহাকাশে অ্যাপল পণ্যের উপস্থিতি একেবারে নতুন নয়।
- ২০১১ সালে স্পেস শাটলের শেষ অভিযানে দুটি আইফোন ৪ পাঠানো হয়েছিল
- বিভিন্ন সময় কক্ষপথে দেখা গেছে অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস ও আইপ্যাড
- এমনকি ১৯৯১ সালে ম্যাকিনটোশ পোর্টেবল কম্পিউটার ব্যবহার করে মহাকাশ থেকে প্রথম ই–মেইল পাঠানো হয়
তবে সরকারি মিশনের কঠোর নিয়মের কারণে আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ এত দিন সীমিত ছিল।
মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাসার এই নমনীয় সিদ্ধান্ত কেবল ছবি তোলার অনুমতি নয়—এটি মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রযুক্তি ও মানবিক গল্পের মেলবন্ধনে মহাকাশ এবার পৃথিবীর মানুষের আরও কাছাকাছি আসছে।

