পর্যায় সারণির ভারী ও কৃত্রিম মৌলগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম মেন্ডেলেভিয়াম। ১০১ পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট এই মৌলটি প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না; সম্পূর্ণভাবে গবেষণাগারে তৈরি। আবিষ্কারের সময় এর মাত্র ১৭টি পরমাণু শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল—যা আধুনিক পারমাণবিক রসায়নের ইতিহাসে এক অনন্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
রুশ রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্ডেলিভ–এর সম্মানে মৌলটির নামকরণ করা হয়। পর্যায় সারণি প্রণয়নের মাধ্যমে মৌলসমূহের গাঠনিক সম্পর্ক ব্যাখ্যায় তাঁর অবদান বিশ্ববিজ্ঞানে যুগান্তকারী। সেই উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাতেই ১০১ নম্বর মৌলের নাম রাখা হয় মেন্ডেলেভিয়াম।
আবিষ্কারের দুঃসাহসিক পরীক্ষা
১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের University of California, Berkeley–এর একদল গবেষক সাইক্লোট্রন যন্ত্র ব্যবহার করে এক জটিল পারমাণবিক বিক্রিয়া পরিচালনা করেন। দলের নেতৃত্বে ছিলেন অ্যালবার্ট ঘিওর্সো, সঙ্গে ছিলেন গ্লেন টি সিবর্গসহ আরও কয়েকজন পারমাণবিক রসায়নবিদ।
তাঁরা পারমাণবিক সংখ্যা ৯৯–বিশিষ্ট আইনস্টাইনিয়াম-২৫৩–এর প্রায় ১০০ কোটি পরমাণুকে হিলিয়াম আয়ন (আলফা কণা) দিয়ে আঘাত করেন। দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরীক্ষার পর তারা সফলভাবে মেন্ডেলেভিয়াম-২৫৬ আইসোটোপ শনাক্ত করেন। তবে উৎপাদিত মৌলের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৭টি পরমাণু—যা দিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন মৌল চিহ্নিত করা ছিল তৎকালীন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এক বিস্ময়কর সাফল্য।
বর্তমানে উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির সহায়তায় কয়েক মিলিয়ন পরমাণু পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হলেও সেই সময়ের তুলনায় এটি ছিল বিপ্লবাত্মক অগ্রগতি।
বৈশিষ্ট্য ও স্থায়িত্ব
মেন্ডেলেভিয়াম অ্যাক্টিনয়েড সিরিজভুক্ত একটি তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং স্বাভাবিক পরিবেশে এর অস্তিত্ব নেই। এখন পর্যন্ত এর ১৬টি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল মেন্ডেলেভিয়াম-২৫৮, যার অর্ধায়ু প্রায় ৫১.৫ দিন। প্রথম আবিষ্কৃত আইসোটোপ মেন্ডেলেভিয়াম-২৫৬–এর অর্ধায়ু ছিল মাত্র ৭৮ মিনিট।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মেন্ডেলেভিয়াম প্রধানত +৩ জারণ অবস্থা প্রদর্শন করে, যদিও সীমিত পরিসরে +২ জারণ অবস্থাও পর্যবেক্ষিত হয়েছে। ভারী মৌলগুলোর রাসায়নিক ধর্ম বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহার ও ঝুঁকি
মেন্ডেলেভিয়াম প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না এবং এটি তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে সাধারণ শিল্প বা চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহার নেই। এটি মূলত মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়—বিশেষ করে ভারী ও অতিভারী মৌলগুলোর পারমাণবিক গঠন এবং স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে।
এই মৌলের কোনো জীবতাত্ত্বিক ভূমিকা নেই। তেজস্ক্রিয়তার কারণে এটি মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তবে গবেষণাগারের বাইরে এর অস্তিত্ব না থাকায় বাস্তব জীবনে সেই আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মেন্ডেলেভিয়ামের মতো কৃত্রিম মৌল আবিষ্কার কেবল নতুন উপাদান যোগ করাই নয়—বরং এটি পরমাণুর গঠন, নিউক্লিয়ার স্থায়িত্ব এবং মহাবিশ্বে মৌল সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও গভীর করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের পথে এমন আবিষ্কারই বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

