বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধীরা দিন দিন আরও কৌশলী হয়ে উঠছে। নতুন এক প্রবণতায় তারা সাধারণ ব্যবহারকারীর বাড়ির ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আইপি ঠিকানাকে ব্যবহার করছে ‘ইন্টারমিডিয়ারি সার্ভার’ হিসেবে। এতে করে অপরাধীরা নিজেদের প্রকৃত অবস্থান গোপন রেখে অনলাইনে বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম চালাতে পারছে। এ বিষয়ে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা Federal Bureau of Investigation (এফবিআই)।
কীভাবে কাজ করে এই কৌশল
এফবিআইয়ের তথ্যমতে, ‘রেসিডেনশিয়াল প্রক্সি’ নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা বৈধ ব্যবহারকারীর আইপি ঠিকানা কাজে লাগায়। ফলে কোনো ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কাছে অপরাধীর আসল পরিচয় ধরা পড়ে না—বরং সেটি সাধারণ ব্যবহারকারীর মতো দেখায়।
সহজভাবে বললে, আপনি ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন—কিন্তু আপনার অজান্তেই আপনার সংযোগ ব্যবহার করে অন্য কেউ অপরাধমূলক কাজ করছে। এতে করে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন নিরীহ ব্যবহারকারীরাও।
রেসিডেনশিয়াল প্রক্সি আসলে কী
রেসিডেনশিয়াল প্রক্সি হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে একটি ডিভাইসের ইন্টারনেট অনুরোধ অন্য একটি ডিভাইসের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এখানে ব্যবহার করা হয় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের (ISP) দেওয়া বৈধ আইপি ঠিকানা।
সাইবার অপরাধীরা সাধারণত স্মার্ট টিভি, স্মার্টফোন, রাউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন Internet of Things (আইওটি) ডিভাইস হ্যাক করে এই নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এসব ডিভাইসের মালিক অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তাদের সংযোগ ব্যবহার হচ্ছে।
কীভাবে আপনার ডিভাইস দখলে নেয় হ্যাকাররা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি উপায়ে অপরাধীরা রেসিডেনশিয়াল আইপি সংগ্রহ করে—
১. ব্যবহারকারীর সম্মতিতে (লুকানো শর্তে):
কিছু ফ্রি Virtual Private Network (ভিপিএন) বা অ্যাপ ব্যবহারকারীর অজান্তেই তাদের ডিভাইসকে প্রক্সি নেটওয়ার্কে যুক্ত করে। জটিল শর্তাবলির ভেতরে এসব তথ্য লুকানো থাকে।
২. সম্পূর্ণ অজান্তে (হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে):
- ম্যালওয়্যার সংক্রমণ
- পাইরেটেড সফটওয়্যার বা গেম ডাউনলোড
- সন্দেহজনক অ্যাপ ইনস্টল
- ডিভাইসে ‘ব্যাকডোর’ তৈরি
এমনকি অনেক সময় নতুন কেনা ডিভাইসেও আগে থেকেই ক্ষতিকর সফটওয়্যার থাকতে পারে।
কিছু অ্যাপ আবার “প্যাসিভ ইনকাম” বা অতিরিক্ত আয় করার লোভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করার অনুমতি নেয়—যা পরে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
কোন ধরনের অপরাধ বেশি হচ্ছে
রেসিডেনশিয়াল প্রক্সি ব্যবহার করে অপরাধীরা নিজেদের পরিচয় আড়াল করে নানা ধরনের সাইবার অপরাধ চালায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ম্যালওয়্যার ছড়ানো
- ফিশিং আক্রমণ
- ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি
- স্প্যাম বা অবাঞ্ছিত বার্তা পাঠানো
- তথ্য চুরি ও পাচার
- পাসওয়ার্ড ভাঙার চেষ্টা (ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক)
- আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে কনটেন্ট ব্যবহার
- অবৈধ অনলাইন মার্কেট পরিচালনা
ফলে একটি নিরীহ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও অজান্তেই বড় ধরনের সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারেন।
নিরাপদ থাকতে যা করবেন
এফবিআই ব্যবহারকারীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে—
- অজানা উৎসের ফ্রি স্ট্রিমিং ডিভাইস ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
- সন্দেহজনক ই-মেইল, লিংক বা পপআপে ক্লিক করবেন না
- পাইরেটেড সফটওয়্যার, গেম বা সিনেমা ডাউনলোড করবেন না
- নিয়মিত ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন
- রাউটার ও ডিভাইসের সফটওয়্যার আপডেট রাখুন
- নেটওয়ার্কে সংযুক্ত ডিভাইসগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন
সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। তাই শুধুমাত্র অ্যান্টিভাইরাস বা সফটওয়্যার নয়—ব্যবহারকারীর সচেতনতা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
আপনার ইন্টারনেট সংযোগ নিরাপদ রাখা মানেই শুধু ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা নয়—বরং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা।

