অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ অ্যাপ স্ন্যাপচ্যাট। দেশটির নতুন আইন মেনে চলতে গিয়ে এখন পর্যন্ত চার লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে প্ল্যাটফর্মটি। সম্প্রতি এক ব্লগ পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে স্ন্যাপচ্যাট কর্তৃপক্ষ।
স্ন্যাপচ্যাট জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ নাগাদ অস্ট্রেলিয়ায় বন্ধ করা এসব অ্যাকাউন্টের ব্যবহারকারীরা হয় নিজেরাই বয়স ১৬ বছরের কম উল্লেখ করেছিলেন, অথবা প্ল্যাটফর্মটির নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রতিদিনই নতুন করে বয়স যাচাই ও অ্যাকাউন্ট বন্ধের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়া সরকার শিশু ও কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০টি বড় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এই তালিকায় স্ন্যাপচ্যাট ছাড়াও আরও কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পরপরই এর প্রাথমিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ জানান, আইন কার্যকর হওয়ার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৪৭ লাখ অ্যাকাউন্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এ উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনাও সামনে এসেছে।
কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, স্ন্যাপচ্যাটের মুখমণ্ডল বিশ্লেষণ করে বয়স শনাক্ত করার প্রযুক্তি সহজেই ফাঁকি দিতে পারছে অনেক টিনএজার। এ প্রসঙ্গে স্ন্যাপচ্যাট স্বীকার করেছে, বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তিতে এখনো বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গত বছরের এক পরীক্ষামূলক ট্রায়ালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মুখমণ্ডলভিত্তিক বয়স নির্ধারণ পদ্ধতিতে সাধারণত প্রকৃত বয়সের তুলনায় ২ থেকে ৩ বছরের পার্থক্য থেকে যায়।
এর ফলে একদিকে যেমন ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে, অন্যদিকে ১৬ বছরের বেশি বয়সী কিছু ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট ভুলবশত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। স্ন্যাপচ্যাটের মতে, এসব ‘ফাঁকফোকর’ পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এছাড়া প্ল্যাটফর্মটি সতর্ক করে বলেছে, এমন অনেক মেসেজিং ও যোগাযোগভিত্তিক অ্যাপ রয়েছে, যেগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েনি। ফলে কিশোর-কিশোরীরা স্ন্যাপচ্যাটের মতো নিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বিকল্প ও তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত অ্যাপের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ই-সেইফটি কমিশনার কার্যালয় জানিয়েছে, যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১০টি প্ল্যাটফর্মকে নজরদারির আওতায় এনেছে, তবে বাস্তবে অস্ট্রেলীয় ব্যবহারকারী রয়েছে—এমন সব প্ল্যাটফর্মই পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। গত মাসে ই-সেইফটি কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট বলেন, তাদের দল ছোট হওয়ায় শুরুতে বেশি ব্যবহারকারী থাকা প্ল্যাটফর্মগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে ছোট প্ল্যাটফর্মগুলোকেও পর্যায়ক্রমে নজরদারিতে আনা হবে।
এদিকে, স্ন্যাপচ্যাট ও মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি জানিয়েছে, বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব সরাসরি অ্যাপ পর্যায়ে না রেখে গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের মতো কেন্দ্রীয় অ্যাপ মার্কেটপ্লেসে সম্পন্ন করা হলে তা আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশেও শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নীতিমালায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।

