কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে এখন বিভিন্ন ধরনের লেখা—ব্লগ, প্রবন্ধ, ই-মেইল, এমনকি গবেষণাপত্র ও সংবাদ বিশ্লেষণ—সহজেই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনলাইন তথ্যভান্ডার Wikipedia তাদের প্ল্যাটফর্মে এআই-নির্ভর কনটেন্ট ব্যবহারের ওপর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন নীতিমালার আওতায় সরাসরি এআই দ্বারা তৈরি লেখা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যাতে তথ্যের মান ও নির্ভরযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
আংশিক ব্যবহার, তবে মানব যাচাই বাধ্যতামূলক
উইকিপিডিয়ার নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদকরা চাইলে এআই টুল ব্যবহার করে কোনো নিবন্ধ অনুবাদ বা প্রাথমিক খসড়া তৈরির সহায়তা নিতে পারবেন। তবে সেই কনটেন্ট সরাসরি প্রকাশ করা যাবে না। অবশ্যই মানবসম্পাদকের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার পরই তা প্রকাশের অনুমতি পাবে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন ভাষার সংস্করণে কাজ করছেন। তাদের কাজের মান বজায় রাখতেই এই নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে।
‘হ্যালুসিনেশন’ সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ
এআই কনটেন্টের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে তথাকথিত ‘হ্যালুসিনেশন’ বা বিভ্রম। অনেক সময় এআই মডেল এমন তথ্য তৈরি করে, যা বাস্তবে নেই বা যাচাইযোগ্য নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া রেফারেন্স, অকার্যকর লিংক কিংবা ভুল তথ্যও যুক্ত হয়ে যায় কনটেন্টে।
উইকিপিডিয়ার মতো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নিরপেক্ষতা ও যাচাইযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ধরনের ভুল তথ্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এআই-নির্ভর কনটেন্ট তাদের মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় কঠোর সিদ্ধান্ত
প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২৫ বছরে উইকিপিডিয়া মানুষের তৈরি তথ্যের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিনামূল্যে তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি তারা সবসময় তথ্যের মান, উৎস যাচাই এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই-এর দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে উইকিপিডিয়ার এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি শুধু তথ্যভান্ডারগুলোর জন্য নয়, বরং সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।
প্রযুক্তি ও মানবসম্পাদনার ভারসাম্য জরুরি
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, বরং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক খসড়া তৈরি, অনুবাদ বা তথ্য বিশ্লেষণে এআই সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চূড়ান্ত কনটেন্টে মানবসম্পাদনার বিকল্প নেই।
সামগ্রিকভাবে, উইকিপিডিয়ার এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিচ্ছে—প্রযুক্তির যুগে তথ্যের গতি যতই বাড়ুক, বিশ্বাসযোগ্যতা ও মান বজায় রাখতে মানবিক নজরদারি এখনো অপরিহার্য।

