মেরু অঞ্চলের রাতের আকাশে দেখা যায় এক অপার্থিব আলোর খেলা—সবুজ, বেগুনি কিংবা লাল রঙের ঢেউয়ের মতো নাচতে থাকা এই দৃশ্যই অরোরা বা মেরুজ্যোতি নামে পরিচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মানুষকে মুগ্ধ করলেও এর পেছনের বৈজ্ঞানিক রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। বিশেষ করে, এই আলোকচ্ছটার সঙ্গে জড়িত জটিল বৈদ্যুতিক প্রবাহ কীভাবে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়ে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নতুন এক গবেষণা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে NASA।
এই লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার পোকার ফ্ল্যাট রিসার্চ রেঞ্জ থেকে দুটি গবেষণা রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। “GNEISS” নামে পরিচিত এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো অরোরার ভেতরে প্রবেশ করে এর একটি ত্রিমাত্রিক বৈদ্যুতিক মানচিত্র তৈরি করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিটি স্ক্যান প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করা যায় এই পদ্ধতিকে—যেভাবে সিটি স্ক্যান শরীরের অভ্যন্তরের গঠন বিশ্লেষণ করে, ঠিক তেমনভাবেই এই রকেটগুলো অরোরার ভেতরের গঠন ও প্রবাহ বিশ্লেষণ করবে।
অভিযানে ব্যবহৃত দুটি রকেট পাশাপাশি উড়ে অরোরার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করবে। এই সময় প্রতিটি রকেট থেকে চারটি করে ছোট সাব-পেলোড বা যন্ত্রাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়বে। এই যন্ত্রগুলো পৃথিবীতে থাকা গ্রাউন্ড স্টেশনে রেডিও সংকেত পাঠাবে। অরোরার ভেতরে থাকা আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমার কারণে এই সংকেতগুলোর পরিবর্তন হবে, আর সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করবেন—ইলেকট্রন প্রবাহের দিক, ঘনত্ব এবং গতিপথ।
Dartmouth College-এর অধ্যাপক ক্রিস্টিনা লিঞ্চ বলেন, “আমরা শুধু রকেটের গতিপথ নয়, বরং বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে এই বৈদ্যুতিক প্রবাহ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি বোঝার চেষ্টা করছি। এটি মূলত বায়ুমণ্ডলের প্লাজমা স্তরের একটি বৃহৎ স্ক্যানিং প্রক্রিয়া।”
বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন, সূর্য থেকে আসা উচ্চ-শক্তির ইলেকট্রন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়, যার ফলেই সৃষ্টি হয় অরোরা। তবে এই ইলেকট্রনগুলো কীভাবে তাদের শক্তির চক্র সম্পন্ন করে বা পুনরায় ফিরে যায়—এটি এখনো বড় এক অজানা প্রশ্ন।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলেই সীমাবদ্ধ নয়। বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে এই বৈদ্যুতিক প্রবাহ তাপ উৎপন্ন করে এবং বায়ুর অস্থিতিশীলতা বা টার্বুলেন্স তৈরি করতে পারে, যা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি জিপিএস, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং অন্যান্য মহাকাশনির্ভর প্রযুক্তিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
নাসা আশা করছে, এই রকেট অভিযানের তথ্য তাদের বিদ্যমান স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় করে মহাকাশবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একইসঙ্গে এটি ভবিষ্যতে মহাকাশ প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতেও সহায়ক হবে।
এদিকে, অরোরার আরেকটি রহস্যময় দিক “ব্ল্যাক অরোরা” নিয়েও গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছে নাসা। উজ্জ্বল আলোর মাঝেও যে অন্ধকার অঞ্চল দেখা যায়, সেটিকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞানীদের ধারণা—সেখানে হয়তো বৈদ্যুতিক প্রবাহের দিক হঠাৎ পরিবর্তিত হয়। এই অদৃশ্য ও অজানা ঘটনাগুলোর রহস্য উদঘাটনে চলমান গবেষণা ভবিষ্যতে মহাকাশ ও বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

