দীর্ঘদিনের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পর অবশেষে সফলভাবে আকাশে উড়েছে পরীক্ষামূলক সুপারসনিক উড়োজাহাজ X-59 Quiet Supersonic Technology aircraft। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা Lockheed Martin-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই বিশেষ উড়োজাহাজ শব্দের গতিবেগ অতিক্রম করলেও প্রচলিত তীব্র ‘সনিক বুম’ তৈরি করে না—যা ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক সুপারসনিক বিমান চলাচলের জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় সম্পন্ন হয়। পরীক্ষায় উড়োজাহাজটি United States Air Force Plant 42 থেকে উড্ডয়ন করে প্রায় ২৬ মাইল পথ অতিক্রম করে NASA Armstrong Flight Research Center-এ অবতরণ করে। সংক্ষিপ্ত হলেও এই উড্ডয়নকে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক ফ্লাইট টেস্ট পর্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পরীক্ষাটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে এবং উড়োজাহাজ প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
এক্স–৫৯-এর পূর্ণ নাম ‘কুইয়েট সুপারসনিক টেকনোলজি এয়ারক্রাফট’। এর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শব্দের গতিবেগ অতিক্রমের সময় তৈরি হওয়া প্রচলিত তীব্র বিস্ফোরণধর্মী শব্দ—যাকে ‘সনিক বুম’ বলা হয়—তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যায়। সাধারণত সুপারসনিক গতিতে উড়োজাহাজ চলার সময় এই সনিক বুম ভূমিতে তীব্র শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এবং কখনও কখনও স্থাপনার ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি করে।
এই সমস্যার কারণেই ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্থলভাগের ওপর দিয়ে সুপারসনিক উড্ডয়ন কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়। তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং নতুন গবেষণার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন। নাসার দাবি, এক্স–৫৯ আকাশে উড়ার সময় প্রচলিত বিকট সনিক বুমের পরিবর্তে কেবল মৃদু ‘থাম্প’ ধরনের শব্দ তৈরি করবে, যা মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম বিরক্তিকর।
এক্স–৫৯ প্রকল্পটি নাসার NASA Quesst Mission কর্মসূচির অংশ। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের নীরব সুপারসনিক উড্ডয়নের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা যাচাই করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের ওপর দিয়ে এই উড়োজাহাজ পরিচালনা করা হবে এবং মাটিতে থাকা মানুষের কাছ থেকে শব্দসংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করা হবে।
নাসা জানিয়েছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে সুপারসনিক বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য গ্রহণযোগ্য শব্দমাত্রা নির্ধারণে সহায়তা করা হবে। পরে সেই গবেষণালব্ধ তথ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে, যাতে নতুন প্রজন্মের সুপারসনিক যাত্রীবাহী বিমানের জন্য নীতিমালা তৈরি করা সহজ হয়।
এর আগে ২০১৯ সালে নাসা একটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে, যার মাধ্যমে আকাশে তৈরি হওয়া সনিক বুমের চাপ তরঙ্গের দৃশ্যমান চিত্র ধারণ করা সম্ভব হয়। গবেষকরা আশা করছেন, নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় ভবিষ্যতে শব্দদূষণ কমিয়ে উচ্চগতির আকাশপথ ভ্রমণ বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
২০১৮ সালে এক্স–৫৯ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় লকহিড মার্টিনকে। প্রথমে ২০২১ সালে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিকল্পনা থাকলেও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সময়সূচি পিছিয়ে যায় এবং অবশেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এর প্রথম সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়।
প্রায় ৯৯ দশমিক ৭ ফুট দীর্ঘ এই উড়োজাহাজের ডানার বিস্তার ২৯ দশমিক ৫৭ ফুট। এতে ব্যবহৃত হয়েছে General Electric-এর তৈরি F414 জেট ইঞ্জিন। উড়োজাহাজটি সর্বোচ্চ ম্যাক ১ দশমিক ৫ গতিতে—অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ৯৯০ মাইল বেগে উড়তে সক্ষম। এর স্বাভাবিক ক্রুজিং গতি ম্যাক ১ দশমিক ৪২, যা প্রায় ৯৪০ মাইল প্রতি ঘণ্টা।
নকশাগত দিক থেকেও এক্স–৫৯ বেশ ব্যতিক্রম। এতে প্রচলিত সামনের ককপিট জানালা নেই। এর পরিবর্তে পাইলটরা সামনে স্থাপিত ৪কে রেজোল্যুশনের ডিজিটাল মনিটরের মাধ্যমে বাইরের দৃশ্য দেখতে পারবেন। এই আধুনিক ভিজ্যুয়াল সিস্টেমের মাধ্যমে বিমানের দীর্ঘ ও সরু নাকের কারণে সৃষ্ট দৃষ্টিসীমা সমস্যাও সমাধান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনের মতো দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রা সময় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে—তাও আবার প্রচণ্ড শব্দদূষণ ছাড়াই। ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সুপারসনিক বিমান চলাচলের নতুন যুগের সূচনা ঘটতে পারে।

