বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্মার্ট চশমা বা স্মার্ট গ্লাস প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা ও ইন্টারনেট সংযোগের সুবিধা থাকায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। তবে প্রযুক্তিটির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। কারণ বাইরে থেকে বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে—কেউ সাধারণ চশমা ব্যবহার করছেন নাকি ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা পরেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষের অজান্তেই ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে নতুন অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ‘নিয়ারবাই গ্লাসেস’, যা আশপাশে স্মার্ট চশমা থাকলে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করতে পারে বলে দাবি করেছেন এর নির্মাতা।
কীভাবে কাজ করে অ্যাপটি
অ্যাপটির নির্মাতা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইভ জঁরেনোর দাবি, ‘নিয়ারবাই গ্লাসেস’ মূলত ব্লুটুথ সংকেত শনাক্ত করার মাধ্যমে আশপাশে থাকা স্মার্ট চশমা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। অনেক স্মার্ট গ্লাস—বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তৈরি ডিভাইস—ফোনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে ব্লুটুথ সংকেত ব্যবহার করে।
অ্যাপটি সেই সংকেত শনাক্ত করতে পারলে ব্যবহারকারীর স্মার্টফোনে একটি সতর্কবার্তা পাঠায়। এর ফলে ব্যবহারকারী আগে থেকেই জানতে পারেন যে আশপাশে কোনো ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা থাকতে পারে।
নির্মাতার মতে, স্মার্ট চশমা সাধারণ চশমার মতোই দেখতে হওয়ায় অনেক সময় বোঝা যায় না কেউ ভিডিও ধারণ করছে কি না। এই অনিশ্চয়তা কমাতে এবং ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে।
স্মার্ট চশমা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
স্মার্ট চশমা প্রযুক্তি নিয়ে গোপন নজরদারি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা নতুন নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার তৈরি রে–ব্যান স্মার্ট চশমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের চশমা ব্যবহার করে মানুষের অজান্তেই ভিডিও ধারণ বা ছবি তোলার ঘটনা ঘটেছে। প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে গোপন নজরদারির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইভ জঁরেনো মনে করেন, স্মার্ট গ্লাস প্রযুক্তি যদি যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকে, তাহলে এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, একসময় এই প্রযুক্তি “ভয়ংকর প্রযুক্তি” হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ভিডিও পর্যালোচনা নিয়ে নতুন বিতর্ক
এদিকে মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্মার্ট চশমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আফ্রিকার কেনিয়ায় কর্মরত কিছু প্রযুক্তিকর্মী স্মার্ট চশমা দিয়ে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করছেন।
একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই কর্মীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন যে পর্যালোচনাধীন ভিডিওগুলোর মধ্যে এমন দৃশ্যও রয়েছে যেখানে মানুষ টয়লেটে যাচ্ছেন, পোশাক পরিবর্তন করছেন কিংবা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে রয়েছেন।
একজন কর্মীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কিছু ভিডিওতে দেখা যায় কেউ টয়লেটে যাচ্ছেন বা পোশাক খুলছেন। আমার মনে হয় না তারা জানতেন যে এসব মুহূর্ত রেকর্ড করা হচ্ছে।”
জানা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ডেটা চিহ্নিতকরণ বা লেবেলিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অ্যাপটির সীমাবদ্ধতা
যদিও ‘নিয়ারবাই গ্লাসেস’ অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে সহায়ক হতে পারে, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নির্মাতার তথ্য অনুযায়ী, ব্লুটুথ সংকেত শনাক্ত করার সময় কখনো কখনো ভুল সতর্কবার্তাও দিতে পারে অ্যাপটি।
কারণ, স্মার্ট চশমা ছাড়াও একই ধরনের সংকেত ব্যবহার করা অন্য কোনো ডিভাইস—যেমন স্মার্টফোন বা ওয়্যারলেস ডিভাইস—ভুলভাবে শনাক্ত হতে পারে।
প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়ছে গোপনীয়তার চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট চশমা, এআই ক্যামেরা ও ওয়্যারেবল প্রযুক্তি যত জনপ্রিয় হবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা তত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। তাই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ব্যবহারকারীদেরও সচেতন থাকতে হবে।
‘নিয়ারবাই গ্লাসেস’–এর মতো উদ্যোগগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।

