চীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার হ্যাক করে বিপুল পরিমাণ গোপন ও সংবেদনশীল তথ্য চুরির ঘটনা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, এই ঘটনাকে চীনের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাইবার নিরাপত্তা বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুরি হওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত গোপন নথি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির নকশা, উন্নত যুদ্ধবিমান উন্নয়ন সংক্রান্ত ডেটা এবং সামরিক সিমুলেশন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এসব তথ্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা কোনো রাষ্ট্র বা গোয়েন্দা সংস্থার জন্য বড় ধরনের সুবিধা এনে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সাইবার হামলায় প্রায় ১০ পেটাবাইটেরও বেশি তথ্য চুরি হয়ে থাকতে পারে। তুলনামূলকভাবে বলতে গেলে, ১ পেটাবাইট সমান ১ হাজার টেরাবাইট—যেখানে একটি সাধারণ ল্যাপটপে সাধারণত ১ টেরাবাইট ডেটা সংরক্ষণ করা যায়। সেই হিসেবে এই ডেটা ফাঁসের পরিমাণ কতটা বিশাল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। যদি এই পরিসংখ্যান সত্য হয়, তবে এটি হবে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থেকে তথ্য চুরির অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা।
ধারণা করা হচ্ছে, তিয়ানজিনে অবস্থিত ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টার (এনএসসিসি) এই সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। এই কেন্দ্রটি চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, যা মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়োজিত হাজারো প্রতিষ্ঠানের জন্য ডেটা প্রসেসিং ও কম্পিউটিং সেবা প্রদান করে থাকে। ফলে এই কেন্দ্র থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, হামলাকারীরা একটি দুর্বল ভিপিএন এন্ট্রি পয়েন্ট ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করে। এরপর তারা দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করে, যাতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সতর্কবার্তা সক্রিয় না হয়। এ ক্ষেত্রে ‘বটনেট’ ভিত্তিক একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ছোট ছোট অংশে ডেটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সনাক্ত করা আরও কঠিন করে তোলে।
ঘটনার আরও উদ্বেগজনক দিক হলো—এই তথ্য চুরির কিছু নমুনা ইতোমধ্যে অনলাইনে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ফ্লেমিংচায়না’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে টেলিগ্রামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত এসব নমুনায় অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, সামরিক প্রযুক্তি, বায়োইনফরমেটিকস এবং ফিউশন সিমুলেশন–সংক্রান্ত গবেষণার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকাশিত ডেটার মধ্যে চীনা ভাষায় ‘গোপনীয়’ চিহ্নিত একাধিক নথি রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা প্রযুক্তির কারিগরি নকশা, বিভিন্ন সিমুলেশন ডেটা এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রেন্ডারিং ফাইলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব তথ্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এ বিষয়ে প্রকাশিত সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। তারপরও প্রাথমিক পর্যায়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে অনেক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই ধারণা করছেন, ফাঁস হওয়া তথ্যের একটি বড় অংশই বাস্তব এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এই ঘটনার পর বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো যত বেশি বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

