ফরিদপুরের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। অনলাইনে সেই এলাকার স্কুলের নামটা পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই স্কুলেরই নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আজ আইসিটি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের মঞ্চে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর নাম মোঃ রাকিবুল হাসান। সিজন ৩-এর গালা রাউন্ডের দিকে তাকিয়ে থাকা হাজারো শিক্ষার্থীর মধ্যে রাকিবুলের গল্পটা একটু আলাদা — এটা কেবল একটি প্রতিযোগিতার গল্প নয়, এটা বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা একটি স্বপ্নের গল্প।
রাকিবুলের পরিবারের আয়ের কোনো নির্দিষ্ট উৎস নেই। গ্রামে বসবাস করা তাঁর বাবা প্রতিদিনের সংগ্রামে কোনোভাবে সংসার চালান। তবুও সীমাবদ্ধতার সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে, ছেলের প্রযুক্তি নিয়ে বড় কিছু করার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে তিনি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাকে একটি ল্যাপটপ উপহার দিয়েছিলেন। ‘আমার বাবা বিশ্বাস করতেন, আইসিটি এমন একটি ক্ষেত্র যার মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নই নয়, দেশ ও বিশ্বেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব’ — বলছেন রাকিবুল।
“শুরুতে ভয় পাওয়া খুব স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা যেন থেমে যাওয়ার কারণ না হয়। আমিও একসময় গ্রামের একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলাম, যেখানে পর্যাপ্ত রিসোর্স বা গাইডলাইন ছিল না।”
রাকিবুল জানান, নিজের এলাকায় আইসিটি শেখার সুযোগ প্রায় ছিলই না। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাঁর স্কুলের নাম পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যেত না। তবুও হাল ছাড়েননি। ইউটিউব, ফ্রি অনলাইন রিসোর্স আর নিজের অদম্য ইচ্ছার জোরে ধীরে ধীরে গড়ে নিয়েছেন নিজেকে। আইসিটি অলিম্পিয়াডের মেন্টরশিপ সেশনগুলো তাঁর কাছে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে — যেখানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখানো হয়।
রাকিবুলের মতোই রাজশাহী থেকে এসেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর জুহায়ের উল ইসলাম, যাকে সবাই আসিফ নামে চেনে। রাজশাহীতে প্রথম দিকে ভালো মেন্টরের অভাব ছিল। কিন্তু অনলাইন রিসোর্স আর আইসিটি অলিম্পিয়াডের মেন্টরশিপ সেশনকে কাজে লাগিয়ে সেই বাধা পেরিয়েছেন আসিফ। সিজন ৩-এর গালা রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছেন তিনি।
আসিফের মতে, আইসিটি অলিম্পিয়াড তাঁকে শিখিয়েছে যে প্রোগ্রামিং শুধু সিনট্যাক্স নয় — এটি একটি মানসিকতা। জটিল সমস্যাকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে সমাধান করার কৌশল, টিমওয়ার্ক আর লজিক্যাল থিংকিং — এই তিনটি গুণই আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। মায়ের অবিরাম মানসিক ও আর্থিক সমর্থন ছাড়া এই পথে এগোনো সম্ভব হতো না বলে জানান তিনি।
এই দুজনের পাশাপাশি ঝিনাইদহ থেকে এসেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ আন নাহিয়ান প্রিন্স। তাঁর গল্পটা আরও অনুপ্রেরণামূলক। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়াশোনার পর সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়েছেন। আইসিটি অলিম্পিয়াড তাঁর সেই সংকল্পকে আরও শক্ত করেছে।
খুলনার নেভি অ্যাঙ্কোরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ -এর শিক্ষার্থী জি এম সোহাদ হোসেন সৌরভ জানান, ইন্টারনেটের অস্থিতিশীলতা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু অফলাইন রিসোর্স সংগ্রহ করে আর যখনই সুযোগ পেয়েছেন তখনই পুরোদমে শিখেছেন — এভাবেই এগিয়ে গেছেন তিনি। বাবা প্রথম কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছিলেন, রাত জেগে কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন — সেই সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন সোহাদ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই শিক্ষার্থীরা সেই মঞ্চে নিজেদের মেধা প্রমাণ করবেন। ফরিদপুরের রাকিবুল থেকে রাজশাহীর আসিফ, ঝিনাইদহের নাহিয়ান থেকে খুলনার সোহাদ — প্রত্যেকেই প্রমাণ করছেন যে সঠিক প্ল্যাটফর্ম পেলে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের মেধাবী সন্তানরা দেশের আইসিটি খাতে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইসিটি অলিম্পিয়াডের এই যাত্রা কেবল একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি জাতীয় আন্দোলন, যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগে এগিয়ে আসতে পারছেন এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করছেন।

