প্রযুক্তি দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই সামনে আসছে এর নৈতিকতা ও মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত জটিল প্রশ্ন। এবার নিজেদের তৈরি এআই মডেল প্রশিক্ষণে অনুমতি ছাড়া বই ও গবেষণা প্রবন্ধ ব্যবহারের অভিযোগে বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট Meta Platforms।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটান ফেডারেল আদালতে বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা যৌথভাবে এই মামলা দায়ের করে। মামলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের মধ্যে রয়েছে Elsevier, Cengage, Hachette, Macmillan এবং McGraw Hill। তাদের অভিযোগ, মেটা বিপুলসংখ্যক কপিরাইট সুরক্ষিত বই ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ সংগ্রহ করে সেগুলো নিজেদের এআই মডেল ‘লামা’ (LLaMA)-এর প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে, যা সরাসরি মেধাস্বত্ব আইনের লঙ্ঘন।
প্রকাশকদের দাবি, এই অননুমোদিত ব্যবহার শুধু লেখক ও গবেষকদের আর্থিক ক্ষতিই করেনি, বরং ভবিষ্যতে সৃজনশীল শিল্পের টিকে থাকার ওপরও হুমকি তৈরি করছে। তারা আদালতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করার পাশাপাশি এমন কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনাও চেয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানান, এআই প্রযুক্তি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কপিরাইটযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করে এআই প্রশিক্ষণ ‘ফেয়ার ইউজ’ বা ন্যায্য ব্যবহারের আওতায় পড়তে পারে। তাই তারা এই মামলায় শক্ত অবস্থান নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, মেটা তাদের এআই প্রশিক্ষণে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের পাশাপাশি জনপ্রিয় সাহিত্যকর্মও ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো The Fifth Season এবং The Wild Robot। প্রকাশকদের মতে, এসব কাজের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার স্পষ্টতই কপিরাইট লঙ্ঘনের শামিল।
এ বিষয়ে Association of American Publishers-এর প্রেসিডেন্ট মারিয়া পালান্টে বলেন, “এ ধরনের ব্যাপক মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন কোনোভাবেই জনকল্যাণমূলক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। যদি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সৃজনশীলতার মূল্যায়নের বদলে পাইরেসিকে উৎসাহিত করে, তবে এআইয়ের প্রকৃত সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইট আইন ও ‘ফেয়ার ইউজ’ নীতির সীমারেখা নতুন করে নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, এই মামলার রায় ভবিষ্যতে এআই শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগেও এআই প্রশিক্ষণে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। OpenAI এবং Anthropic-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও লেখক, শিল্পী ও সংবাদমাধ্যম একাধিকবার আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফলে, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল শিল্পের এই সংঘাত এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

