প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সাইবার অপরাধের ধরন ও কৌশল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তার হ্যাকারদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আগে একটি সাইবার হামলা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়, দক্ষতা এবং জটিল প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন এআই প্রযুক্তির সহায়তায় সেই প্রক্রিয়া অনেক সহজ, দ্রুত এবং বিস্তৃত আকারে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সাইবার হামলার পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের প্রায় প্রতিটি ধাপেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে হ্যাকাররা।
মাইক্রোসফটের প্রকাশিত ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি সাইবার অপরাধীদের জন্য একটি কার্যকর সহায়ক টুলে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা খুব দ্রুত ফিশিং ই–মেইলের খসড়া তৈরি করতে পারে, বিভিন্ন ভাষায় বার্তা অনুবাদ করতে পারে এবং লক্ষ্যবস্তু ব্যবহারকারীদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ও প্রভাবশালী বার্তা প্রস্তুত করতে পারে। ফলে প্রতারণামূলক ই–মেইল বা বার্তাগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে এবং ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ফিশিং আক্রমণই নয়, ম্যালওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হ্যাকাররা এআইভিত্তিক কোডিং টুল ব্যবহার করে ক্ষতিকর সফটওয়্যারের কোড তৈরি, বিদ্যমান কোডের ত্রুটি শনাক্ত এবং দ্রুত সংশোধনের কাজ করছে। পাশাপাশি চুরি হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ, বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরি এবং আক্রমণের কৌশল সাজানোর কাজেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর কনফিগারেশন তৈরি, স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট লেখা এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতেও জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এতে করে সাইবার হামলা পরিচালনার প্রযুক্তিগত জটিলতা অনেকটাই কমে যাচ্ছে এবং আক্রমণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
মাইক্রোসফট থ্রেট ইন্টেলিজেন্স বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের বড় একটি অংশ ভাষাভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে লেখা তৈরি, প্রোগ্রামিং কোড তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে জেনারেটিভ এআই হ্যাকারদের কার্যক্রমকে আরও সহজ ও দ্রুত করে তুলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার হামলা পরিচালনা করতে সক্ষম নয়। আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো মানুষের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। অর্থাৎ এআই মূলত হ্যাকারদের জন্য একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা তাদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
মাইক্রোসফটের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের একাধিক সংগঠিত হ্যাকার দল ইতোমধ্যে তাদের সাইবার হামলার কৌশলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করেছে। এআইভিত্তিক কোডিং টুল ব্যবহার করে তারা নতুন ধরনের ক্ষতিকর কোড তৈরি করছে এবং ম্যালওয়্যারের কার্যপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে। ফলে ভবিষ্যতে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকার, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে শক্তিশালী নীতিমালা এবং আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

