একসময় ঘরের অন্যতম প্রধান যোগাযোগমাধ্যম ছিল ল্যান্ডফোন। স্মার্টফোনের বিস্তৃত ব্যবহারের ফলে সেই প্রযুক্তি প্রায় বিলুপ্তির পথে গেলেও, নতুন প্রজন্মের ব্যবহার প্রবণতা ও অভিভাবকদের নিরাপত্তা-সচেতনতার কারণে আবারও আলোচনায় ফিরছে ল্যান্ডলাইনধর্মী যোগাযোগ ডিভাইস। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তৈরি ‘টিন ক্যান’ নামের একটি আধুনিক যন্ত্রকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার মূল্যের এই ডিভাইসটি মূলত স্ক্রিনবিহীন এবং তারযুক্ত ল্যান্ডফোনের আদলে তৈরি। বড় বোতাম, পাকানো কেবল এবং সরল ইন্টারফেসের কারণে এটি নব্বইয়ের দশকের ক্লাসিক টেলিফোনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তবে বাহ্যিক নকশা পুরোনো হলেও প্রযুক্তিগতভাবে এটি সম্পূর্ণ আধুনিক। প্রচলিত টেলিফোন লাইনের পরিবর্তে এটি ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে, ফলে ইন্টারনেটভিত্তিক ভয়েস কল করা সম্ভব।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ডিভাইসটিতে কোনো অ্যাপ, গেম বা মেসেজিং ফিচার নেই। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরভিত্তিক নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করা। অভিভাবকদের জন্য একটি বিশেষ কন্ট্রোল অ্যাপ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কন্টাক্ট লিস্ট নির্ধারণ করা যায়। ফলে শিশুরা কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিদের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনে।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বাজারে আসার পর থেকেই ‘টিন ক্যান’ উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের জন্য সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল অভিজ্ঞতার চাহিদা বাড়ার কারণে এই ধরনের ডিভাইস জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েক লাখ ইউনিট বিক্রি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলভিত্তিক তিন উদ্যোক্তা—চেট কিটলসন, ম্যাক্স ব্লুমেন ও গ্রেম ডেভিস—নিজেদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ যোগাযোগ ডিভাইস খুঁজতে গিয়েই এই পণ্যটির ধারণা তৈরি করেন। তাঁদের মতে, বর্তমান স্মার্টফোনগুলোতে অতিরিক্ত অ্যাপ ও উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে শিশুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকে তারা সীমিত ফিচারযুক্ত একটি বিকল্প ডিভাইস তৈরির উদ্যোগ নেন।
নকশাগতভাবে ফোনটি পুরোনো ল্যান্ডফোনের অনুপ্রেরণায় তৈরি হলেও এটি চারটি আকর্ষণীয় রঙে বাজারজাত করা হচ্ছে—নীল-সবুজ, বেগুনি-সাদা, হলুদ এবং গোলাপি-কমলা। ডিভাইসটি বিদ্যুৎ সংযোগে চালিত এবং সেটআপ সম্পন্ন হয় সহায়ক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে।
‘টিন ক্যান’-এ একই ডিভাইস ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিনামূল্যে কল করার সুবিধা রয়েছে। তবে সাধারণ মোবাইল নম্বরে কল করতে হলে মাসিক ৯.৯৯ ডলারের সাবস্ক্রিপশন নিতে হয়। এছাড়া ‘কোয়ায়েট আওয়ার্স’ নামে একটি ফিচার রয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ফোনের ইনকামিং ও আউটগোয়িং কল সীমিত করা যায়।
ব্যবহারকারীদের অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এই ধরনের ডিভাইস শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারে শৃঙ্খলা শেখাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা সহজ হচ্ছে।
বর্তমানে ‘টিন ক্যান’ কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলে এটি সম্প্রসারণের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এদিকে বিভিন্ন দেশে স্কুল পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আলোচনা চলমান থাকায় এমন সীমিত ফিচারের ডিভাইসগুলোর চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নীতিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বিকল্প যোগাযোগ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

